শ্বাপদ: রাতের গভীরে এক অলৌকিক বিভীষিকা
রাত তখন প্রায় বারোটা।
আকাশে মেঘ জমেছে, কোথাও
কোথাও বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। রাহুল, এক তরুণ লেখক,
গ্রামটির রহস্যময় ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে এসে এই
জমিদারবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের সাবধানবাণী অগ্রাহ্য করে সে সিদ্ধান্ত
নেয় বাড়ির ভেতর প্রবেশ করবে।
দরজার কাছে আসতেই বাতাসে
হিমেল শীতলতা অনুভূত হয়। দরজাটি এতদিনেও
ভেঙে পড়েনি, কিন্তু তার কাঠে পচন
ধরেছে। এক ঝাপটায় খুলে
যায় দরজা, যেন কেউ অপেক্ষা
করছিল তার জন্য। ভিতরে
পা রাখতেই গুমোট গন্ধ নাকে আসে,
মাটির মেঝেতে পুরনো সময়ের দাগ স্পষ্ট। হঠাৎ
পায়ের নীচে কী যেন
নড়ে উঠল! রাহুল চমকে
তাকায়, কিন্তু কিছুই দেখতে পায় না।
সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই একটা
চাপা হাসির শব্দ ভেসে আসে।
রাহুল পিছু ফিরে দেখে,
নীচের ঘর অন্ধকারে ডুবে
আছে। মনে হলো কেউ
তার ওপর নজর রাখছে।
সে সাহস সঞ্চয় করে
এগিয়ে যায়। পুরনো আসবাব, ধুলো জমে থাকা
চিত্রকর্ম, আর ফাটল ধরা
দেয়াল – পুরো বাড়িটাই যেন
অতীতের এক বিভীষিকাময় চিত্রকল্প।
হঠাৎ তার কানে এল
এক দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। রাহুল থমকে যায়। কাঁপা
কাঁপা হাতে টর্চ জ্বালিয়ে
চারপাশ দেখতে থাকে। কোনো কিছু নেই,
শুধু বাতাসের শব্দ। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই দেয়ালে ঝুলে থাকা এক
পুরনো ছবির দিকে তাকিয়ে
সে হিমশীতল অনুভব করে। ছবিটি একজন
জমিদারের, চোখের চাহনিতে অস্বাভাবিক কিছু ছিল।
হঠাৎ করেই ছবিটির চোখ
নড়ে উঠল!
রাহুল পেছনে হটতে গিয়ে ধাক্কা
খেলো কারও শরীরের সঙ্গে।
দ্রুত পেছন ফিরে দেখল
– সেখানে কিছু নেই। তার
শ্বাস দ্রুততর হচ্ছে। পায়ের নিচে কিসের যেন
কটমট শব্দ! নিচে তাকাতেই দেখল
রক্তের মতো কিছু লাল
তরল গড়িয়ে আসছে মেঝেতে।
“কে আছো?” রাহুল ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল।
একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—একই
সঙ্গে ক্ষীণ এবং কর্কশ। “তুমি
এখানে কেন?”
রাহুলের মুখ থেকে কথা
বেরোচ্ছে না। শব্দটা যেন
চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলছে
তাকে। হঠাৎ বাতাসে একটি
ছায়ামূর্তি স্পষ্ট হলো। তার চোখ
ছিল গভীর কালো, ঠোঁটে
অদ্ভুত এক বিকৃত হাসি।
“তুমি এখানে আসতে পারো না,”
ছায়াটি এগিয়ে এলো।
রাহুল পেছাতে গিয়ে দরজার কাছে পৌঁছে দেখে,
দরজাটি বন্ধ হয়ে গেছে।
সে প্রাণপণে চেষ্টা করল দরজা খুলতে,
কিন্তু কিছুতেই পারল না। হঠাৎ
করেই ঠান্ডা একটি হাত তার
কাঁধে পড়ল।
রাহুল চিৎকার করে উঠল, কিন্তু
তার চিৎকার বাইরের কেউ শুনতে পেল
না। ধীরে ধীরে সমস্ত
কিছু অন্ধকারে ঢেকে গেল, আর
একটি গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে ফিসফিসিয়ে
বলল, “এখন তুমি আমাদের
একজন…”
সেই রাতের পর থেকে রাহুলকে
আর কখনও দেখা যায়নি।
পরিত্যক্ত জমিদারবাড়িটি আরও রহস্যময় হয়ে
উঠল। গ্রামের লোকেরা আজও বলে, রাতে
সেখানে গেলে শোনা যায়
কারো চাপা ফিসফিসানি, আর
একটি ছায়া দেখা যায় জানালার
পাশে দাঁড়িয়ে—যার চোখ দুটো
গভীর কালো, আর ঠোঁটে অদ্ভুত
এক বিকৃত হাসি!
কিন্তু কয়েক মাস পর, একদিন
হঠাৎ করেই রাহুলের বন্ধু
অমিত সেখানে যায়। তার বিশ্বাস ছিল
না ভূত-প্রেতের ব্যাপারে।
তবে জমিদারবাড়ির কাছাকাছি যেতেই সে শুনতে পায়
পরিচিত একটি কণ্ঠস্বর—রাহুলের
কণ্ঠ!
“অমিত... আমাকে বাঁচাও...”
অমিত চমকে ওঠে, কিন্তু
সামনে কাউকে দেখতে পায় না। আতঙ্কে
সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিন্তু যাবার সময় বাড়ির জানালায়
সে এক মুহূর্তের জন্য
দেখে—একটি ছায়ামূর্তি তাকিয়ে
আছে তার দিকে, চোখ
দুটি গভীর কালো... এবং
সেটি ছিল রাহুলের ছায়া!
গ্রামের লোকেরা এখন বলে, শ্বাপদ
একটি নতুন আত্মা পেয়েছে,
এবং এটি এখন আরও
শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। জমিদারবাড়ির
অভিশাপ শেষ হয়নি, বরং
এটি অপেক্ষা করছে নতুন শিকার
পাওয়ার জন্য...

0 Comments